বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সরকার গঠন করার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা বেড়েছে বহুগুণ। “আলহামদুলিল্লাহ”—এই সন্তুষ্টির উচ্চারণ যেমন আছে, তেমনি তৃণমূলের একাংশের মাঝে বাড়ছে এক ধরনের নীরব দূরত্বও। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন?
প্রথমত, ক্ষমতায় যাওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা তৃণমূল কর্মীরা মনে করেন, তাদের অবদান অনুযায়ী মূল্যায়ন হচ্ছে না। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও ফেসবুক আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে—“ত্যাগীদের চেয়ে সুবিধাভোগীরা বেশি জায়গা পাচ্ছে”—এই অভিযোগ।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বড় একটি কারণ। ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ে গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৃণমূলকে বিভক্ত করছে। এতে সাধারণ কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ছে, কারণ তারা নিজেদেরকে মূলধারার বাইরে অনুভব করছে।
তৃতীয়ত, প্রশাসনিক ও দলীয় সমন্বয়ের অভাব। সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মাঝে অনেক সময় তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমে যায়। ফলে মাঠপর্যায়ের সমস্যা, অভিযোগ বা প্রত্যাশা কেন্দ্র পর্যন্ত সঠিকভাবে পৌঁছায় না—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নেতাকর্মীদের ক্ষোভ, অভিমান, এমনকি সমালোচনাও প্রকাশ্যে চলে আসছে। আগে যা দলীয় কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকত, এখন তা জনসম্মুখে আসায় বিভাজন আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।
পঞ্চমত, তরুণ কর্মীদের প্রত্যাশা ভিন্ন। নতুন প্রজন্ম চায় স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং দ্রুত মূল্যায়ন। তারা যদি সেই সুযোগ না পায়, তাহলে সহজেই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে।
ষষ্ঠত, তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন ইস্যু।
বর্তমানে জেলা/মহানগর, থানা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে—তারা তৃণমূলের পুরোনো কর্মীদের তেমন সময় দিচ্ছেন না। বরং নতুন মুখ খোঁজার প্রবণতা বাড়ছে। এর পেছনে একটি কঠিন বাস্তবতাও কাজ করছে—দীর্ঘদিন রাজনীতি করা অনেক ত্যাগী কর্মীর পকেট আজ শূন্য; তারা আর্থিকভাবে দুর্বল। ফলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে অনেক সময় উল্টো অর্থনৈতিক দায় নিতে হয়—এই ভয়ে কিছু নেতা দূরত্ব বজায় রাখছেন।
অন্যদিকে, অভিযোগ রয়েছে—কিছু নেতা বিভিন্ন স্তরে অবস্থান করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এতে করে তৃণমূলের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে—“দল করেছি, কিন্তু ফল পাচ্ছে অন্যরা”—এই মনোভাব ক্রমেই বাড়ছে।এমনও শোনা যায় পিছনে আওয়ামী লীগ কে রেখে পুরনো ব্যবসায় বিএনপির নেতাগন ভাগ বাটোয়ারা করে খাচ্ছে।
এই বাস্তবতা শুধু সম্পর্কের দূরত্বই তৈরি করছে না, বরং দলীয় ঐক্যকেও নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সরকার পরিচালনায় স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা—এসবই প্রশংসিত হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি তার তৃণমূল—এটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
শেষ কথা হচ্ছে—দলকে আরও শক্তিশালী করতে হলে তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো, ত্যাগীদের মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন এবং আর্থিক ও নৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে অর্জন থাকলেও ভেতরের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
রাজনীতি শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়—মানুষের মন ধরে রাখারও লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে তৃণমূলকেই আবার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
সম্পাদকঃ মাহবুবা আক্তার। অফিসঃ ৭৫ ই-ব্রডওয়ে,নিউইয়র্ক এনওয়াই ১০০০২।ফোন:+৮৮০১৭১২৯০৩৪০১ ই- মেইলঃ dailyhaquekotha@gmail.com
প্রকাশিত সংবাদপত্রের অংশ